February 21, 2024

ধর্মের পর ধর্মে স্রষ্টা সাম্প্রদায়িকতা চেয়েছেন! : মুহাম্মদ উমর ফরহাদ

ধরুন আপনি একজন মুক্তমনা, কিংবা অধিক ভাবুক মানুষ। আপনি দেখছেন একবিংশ শতাব্দিতে এসেও সমগ্র পৃথিবীতে ধর্মের আধিপত্য চলছে আজো। আপনি দেখছেন মানুষ ধর্মের প্রতি এতো অনুভূতিশীল, বা এতো হিংস্র যে, অতি সামান্য বিষয়ে হয়ে উঠছে এক একটি ধর্মালম্বী হিংস্র থেকে হিংস্রতর। কখনো কখনো এই হিংস্রতা আঞ্চলিকতা পেরিয়ে, দেশ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কেনো এমন? মানুষ কেনো মানবতা গিলে খেয়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হয়? এর পেছনে স্রষ্টা দায়ি নয় তো?
ঠিক এই রকম বা এমন কিছু ভাবনা আপনার মনে উদয় হয়। অপনি অকপটে এসব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পেছনে স্রষ্টাকে দায়ী করা ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন না আসলে তা না, আপনি প্রকৃত পক্ষে মুক্তমনা নন বলে আপনি আপনার গণ্ডি পেরিয়ে ভাবছেন না। আপনি নিজেকে ভাবুক বা মুক্তমনা দাবি করতেই পারেন, এটা কেবল আপনার দাবি। বাস্তবতা এই দাবির কাছে একেবারেই মৃত। যে সকল ধর্মান্ধদের কথা ভেবে আপনার কষ্ট হয়, যাদের কথা মনে হয়ে আপনার অমানুষ কিংবা বিবেকহীন মুর্খ মনে হয়, আসলে আপনার অজান্তে আপনি নিজেই সেই সকল মানুষদের মধ্যে একজন। হ্যা, আপনিও একজন এবং এটাই সত্য।


আপনি ভেবে দেখতে পাচ্ছেন না একটা কিছু সৃষ্টির পর কেনো তার পরিবর্তন আনা হয়? আপনি কি দেখেন না মানুষ কিছু একটি আবিস্কার করলে, কিছুদিন পর তার নতুন সংস্করণ বের করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে? অন্তত এখন প্রযুক্তির যুগে এসে হাতে হাতে স্মার্টফোন। প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত সফটওয়্যার গুলো আপডেট হয়ে আসছে নতুন ভার্সনে, এবং আপনি তা নতুনত্ব কিছু পাবেন, বা ভালো কিছু আছে ভেবে পুরাতন থেকে পরিবর্তিত হয়ে নিচ্ছেন। তখন আপনার এই ভাবুক মন এ প্রশ্ন জাগায় না, নির্মাতা কেনো এর পরবর্তী সংস্করণ বের করছে? কেনো আপনার মনে হচ্ছে না যে, পূর্ব সংস্করণ ব্যবহারকারীদের সাথে তিনি বৈষম্য সৃষ্টি করছেন? এ প্রেক্ষিতে এটা সত্য, ব্যবহারকারীদের যারা এই নতুন সংস্করণটি গ্রহণ করছে না, তাদের এই সফটওয়্যারের ভার্সন পুরোনো হতে হতে এক সময় ব্যবহৃত ফোনেই অকেজো হয়ে পরছে। কিংবা কোনো নির্মাতা তো আছেন, নতুন সংস্করণে না যাওয়া অবধি প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। বারংবার দেখাচ্ছে “প্রবেশের জন্য নতুন সংস্করণটি হালনাগাদ করুন”।


প্রযুক্তি নির্মাতারা আপনাকে পুরাতনে থাকতে দিচ্ছে না কেনো, এ প্রশ্ন জেগেছে কখনো? এ বিষয় নিয়ে বিতর্কিত লিখনী বা আলোচনা হয় কি? যদি হয়, তা সে গণ্ডি সীমাবদ্ধই থেকে যাচ্ছে।
আচ্ছা আপনি যে ফোনটা ব্যবহার করছেন, তা আপনি কতো বছর ব্যবহার করেন? আজীবন? না তো! মাস ছয়েক, বছরখানেক, বা বড়ো জোর তিন বছর ব্যবহৃত হয়। তারপর আসলে কেনো একে আপনার অনুপযোগি মনে হয়? আপনাকে তো অন্তত দশ বছর ব্যবহার করতে কেউ বাঁধা দিচ্ছে না; যতো জনম টিকে সে অবধিও চাইলে সম্ভব। তবু বদলাচ্ছেন যাবতীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া। কারণ একটাই, আপনি না বদলাতে চাইলেও আপনার মানসিক ইচ্ছে থাকছে না পিছিয়ে থাকার জন্য। যেখানে দেখছেন এ ফোনে এই ফিচার দিয়ে বাজারে আনার পর, পরবর্তী এক বছর পর বাজারে আনছে আরো কিছু সুবিধা নিয়ে ভিন্ন কিছু, যা আসলে আপনার দরকার। দেখছেন প্রতি বছর এখন প্রতিযোগিদের মতো অপারেটিং সুবিধার নতুন নতুন সংস্করণ আসছে। এন্ড্রোয়েড ১২’র পর আপনার ফোনটিতে সর্বোচ্চ ১৪ বা ১৫ আসবে। উইন্ডোজ ১১’র পর, ল্যাপটপটিতে সর্বোচ্চ ১৩ ব্যবহার করতে পারবেন। আপনার হাতের ডিভাইসটি পরিবর্তনে ঐ কোম্পানির প্রতিনিধি এসে সরাসরি জোর করছে না, কিংবা পরামর্শ দিচ্ছে না। কিন্তু আপনি ভালো করে জানেন এই যে একের পর এক নতুন সংস্করণ বের করছে, তাতে তা আপনার প্রযোজন একান্ত না হলেও, মানসিক অবস্থা এমন দাঁড়াচ্ছে, আমি এটা থেকে বঞ্চিত হবো কেনো! অতপর টাকা ঢেলে ফের নতুনে আসতে বাঁধ্য হচ্ছেন। সোজা হিসাব এই, আপনাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না, কিন্তু নতুনত্বের পর নতুনত্বে আপনাকে পরোক্ষ ভাবে মানসিক হস্তক্ষেপ করছে, যা আপনি নিজেই গায়ে মেখে নিচ্ছেন। কেনোনা আপনি মুক্তমনা। আপনি ভাবেন। আর এজন্যই ভাবনা আপনার সাথে যুদ্ধ করে নতুনত্বের সংস্পর্শে এনে দেয়। তবে কেনো বলছেন না ধারাবাহিক পরিবর্তনে আপনার সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে? কিছু দরিদ্রের মতো আপনি পুরাতনে থেকে গেলেও সে সুযোগ আছে। আপনার আমার অজান্তেই মানসিক এ যুদ্ধক্ষেত্র তৈরিতে প্রযুক্তিবিদরা দায়ী নন তাহলে বলুন?
এসব বিষয়ে আসলে এভাবে ভাবেন নি তেমন। সেক্ষেত্রে আপনি উল্টো শোনাতে আসবেন, “আরে এসব তো মানুষেরই প্রয়োজন, একান্ত প্রয়োজন। তুমি তো বিজ্ঞানের ‘ব’ পর্যন্ত জানো না”। ঠিক এইখানেই আপনার মতো সুশীল মুক্তমনাদের অন্ধত্ব কাজ করে। সেই ধর্মান্ধদের মতো আপনারাও কথিত বিজ্ঞানের পূজা করে যাচ্ছেন অন্ধের মতো।


আচ্ছা প্রতিনিয়ত এসব পরিবর্তনের কথা বাদই দিলাম। ধারাবাহিক এই পরিবর্তন মানুষের খুব প্রয়োজন বা জীবিকার্জনে একটা ব্যবসায়ী চক্রের স্বার্থ, তা মূলত মানুষকে ঘিরেই। এবার আসুন দীর্ঘ মেয়াদী কিছু পরিবর্তনের কথা বলি। মনে করুন আপনার বাপ, দাদা, পূর্ব পুরুষ চৌদ্দগোষ্ঠী গ্রামে কাটিয়ে দিয়েছে। আপনিও নিজে জন্মেছেন এক গ্রামে। শৈশব পার করেছেন, খেলাধূলা করেছেন, পড়ালেখা, আনন্দ-উৎসবে বেড়ে ঊঠেছেন এই গ্রামেই। গ্রামকে নিয়ে আপনার কতো স্মৃতি, কতো ঐতিহ্য, কতো ভালোবাসা! এমন কি আপনার প্রিয়ো মা কিংবা বাবা বেঁচে নেই, তাদের কবর গ্রামে আপনাদের নিকটবর্তী এক স্থানে। সেই কবর থেকেও জেনো মা-বাবা আপনার শক্তি, সাহস জোগাচ্ছে। আনন্দঘন মুহুর্তে আপনি অভাববোধ করেন এক সময়, তাঁরা যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজকের এই দিনটি দেখতে পারতেন। তৎক্ষণাত আপনি অবাক ভাবনায় ভেবে উঠেন, আরে তারা তো আমাকে পাশের কাবরস্থান থেকেই দেখছে! তাদের দোয়া এখনো পর্যন্ত আপনার উপর আছে বলেই তো এই দিন বা মুহুর্ত। অথচ দেখুন, এতো এতো নিবিড় ভালোবাসা আঁকড়ে থাকা সত্বেও, শূন্যতা উপেক্ষা করেই আপনি গ্রাম ছেড়ে আজকের আধুনিক শহরকে বরণ করছেন।


যে শহরে পাড়ি দিলেন, তা তো আপনার গ্রাম থেকে বহুদূর। দূরত্ব এতোটা যে, শহরে আসলে কি কি হচ্ছে বা কি কি সুবিধার অন্তর্ভূক্ত সেখানকার নাগরিকগণ, তা আপনি না গেলে কল্পনা করার কথা না। কেউ বললেও শহরের সহজলভ্যতা আপনাকে সেভাবে বুঝিয়ে উপস্থাপন করা সম্ভব না, যা সে থেকে উপলব্ধি করতে পারে। এমন কি প্রযুক্তির দুনিয়ায় আপনার মুঠোফোনে চলমানচিত্রের মাধ্যমে তা দেখিয়ে প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি পরিপূর্ণ অসম্ভব। কেনোনা আপনি এটা জানেন, আপনার গ্রামের চলমানচিত্র মুঠোফোনে ধারণ করলে তারচেয়ে কম সৌন্দর্য ফুটে উঠবে না।


তবে সত্য হলো এই, সুবর্ণ সুবিধায় হাতের নাগালে সবকিছু সহজলভ্য ও আকর্ষণিয় ঢং-এ সাজানো ঐ দূর শহর, আর তার গুণকীর্তন এতো হচ্ছে, এতো শুনছেন আশপাশে, এতো চলমানচিত্র সৃষ্টি হচ্ছে শহরের সৌন্দর্যের ব্যাপারে, যার কিঞ্চিত অংশ আপনার গ্রামকে নিয়ে হচ্ছে না। এতো এতো কিছুর সুবিধা ভেবে আপনি আপনার প্রিয়ো গ্রামের মায়া ত্যাগ করে, সকল ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়ে, কবর থেকে উঠে আসা প্রতি মুহুর্ত নাড়ীর টান ছিন্ন করে, সার্বিক ঐশ্বর্য ঘেরা অধুনিক শহরের দিকে ছুটে চলছেন। আপনি কিন্তু তখন ভাবছেন না, এর জন্য কিছু সৃষ্টিশীল বাণিজ্যিক শক্তি কিভাবে আপনাকে ক্রমশ ধাবিত করে তুলছিলো।


বলতে পারেন আপনি সে সকল মুক্তমনাদের অন্তর্ভূক্ত নন, যারা গ্রাম ত্যাগ করে শহরমুখী হচ্ছে। উল্টো প্রয়োজনের তাগিদে শহরমুখী হয়ে ফের ফিরছেন নাড়ীর টান ঘিরে থাকা এই গ্রামে। এখন চলুন আপনাকে আরেকটু ভাবিয়ে দেখাই গ্রামের একটি মনে না রাখা গল্পের কথা। যেসব উন্নত অঞ্চল আজ শহর নামে পরিচিত, তা কয়েক দশক আগেও এই গ্রামের মতো গ্রাম ছিলো; নির্জন এবং মাছি ভনভন ময়লা স্তুপের মতো বসবাস অনুপযোগি কিছু জায়গা আজকের শহরের বৃহৎ দালান, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। আপনি বুঝছেন না শহরায়নের এই ধারবাহিকতা গ্রামের দিকে ক্রমশ ধাবিত হয়ে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা এনে দিচ্ছে যে? এক সময় না চাইলেও আপনি আধুনিক এই পরিবর্তনের স্রোতে গা ভিজিয়ে দিচ্ছেন, বদলে নিচ্ছেন নিজেকে। আমি তো নিজেই দেখেছি কয়েক ইউনিয়ন ঘিরে যখন পৌরসভার প্রস্তাব আসে, তখন যারা এর সুবিধা সম্পর্কে জানে, বুঝে, যারা মনে করে পৌরসভার এই সুবিধা আমার বর্তমান অবস্থানকে অনেক উন্নত করবে, তখন তারা সেই সুবিধা বাস্তবায়নের পূর্ব ঘোষণার মুহুর্ত থেকে আনন্দিত হতে থাকে। ঠিক বিপরীতে গ্রামের যেসব মানুষ এর অধিক সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবগত নন, তারা বলাবলি করতে থাকে আমরা এর সুযোগ নিতে চাই না। এতে আমাদের এই এই অসুবিধা হবে, এই এই দিকগুলো আমরা হারাতে বসবো। এতে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য হারাতে বসবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন এরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এই জোয়ার ঠেকাতে। কিন্তু বাস্তবতায় শতো চেষ্টা করেও মানুষের সৃজনশীলতার দুনিয়ায় তারা পূর্বের ঐতিহ্যে ঠিক থাকতে পারে না। এক সময় সেই গ্রামটি পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগে পৌরসভার মাধ্যমে শহরায়নে রূপ নেয়। আর ঐ সমস্ত লোক অনিচ্ছা সত্বেও টিকে থাকতে না পেরে ধারাবাহিকতায় আধুনিক সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়। আপনি সে সকলদের একজন হলে, আপনিও কিন্তু পুরোনো সভ্যতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে অসম্ভব হয়ে পরবেন। যদি থাকতেই চান, তবে নিশ্চয়ই আপনি ঐ সমাজের অসামাজিক ব্যক্তি। আপনার না ভালো লাগবে নতুনত্বের পরিবর্তন, না আপনি আপনার অতীতগত ব্যাপার গুলো পূর্বের মতো সেই স্বাদে উপলব্ধি করতে পারবেন।


ধর্ম হচ্ছে ঠিক তেমনই একটি ব্যাপার। স্রষ্টা মানেই নির্মাতা। এখন আমরা মনুষ যখন স্রষ্টা হয়ে উঠি, কোনো একটা আবিস্কারের পর তার পরবর্তী সংস্করণ বের করি, তাহলে আমাদের স্রষ্টা হিসেবে আমরা যাকে মানছি, তার বেলায় দোষ কিসের! সৃষ্টির ধারাবাহিকতাই তো হচ্ছে পরিবর্তনে পরিবর্তনে এক একটি স্তর আবিস্কার করা এবং তা সবকিছুর সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার মতো প্রক্রিয়া হয়ে যাওয়া। স্রষ্টার পরিকল্পনা থাকে বহুদূর থেকে অগণন দূর। সে জানে এর শেষ কি হবে, কতোটুকু পর্যন্ত যেতে চায় এ নিয়ে। সে যতোদিন আছে, এ ধারাবাহিকতা চলমান থাকবেই। তাকে বাঁধা দেয়ার কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। মানুষের স্রষ্টা হয়ে উঠাকে এতো স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেন, সেই ধারাবাহিকতাকে সম্মতি, মৌনসম্মতিতে মেনে নিচ্ছেন। তাহলে কেনো পারবেন না মূল স্রষ্টার সৃষ্টিগত ধারাবাহিকতাকে মেনে নিতে? কিভাবে তবে আপনাকে বা আপনাদের মুক্তমনা বলা যায়! আপনাদের মুক্ত চিন্তা কি তবে এতোই সংকীর্ণ? এতো সংকীর্ণ হলে তো ‘মু্ক্তমনা’ শব্দটির অবমাননা হয়ে যাচ্ছে আপনাদের দ্বারা।
স্বাভাবিক নিয়মে আপনাদের বুঝা উচিৎ স্রষ্টা চেয়েছেন বলেই সে মানুষের মাঝে ধর্মের এতো ধারাবাহিকতা এনেছেন। তিনি দেখতে চেয়েয়েছেন তার পূর্বের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে কে নতুনের সাথে সহজেই মানিয়ে নেয় জেনে বুঝে যে, তা ঐ একই স্রষ্টার; আর কে তা প্রত্যখ্যান করে আয়েশি অজ্ঞ লোকের পরিচয় দেয়। ঐশ্বরিক নতুন ধর্ম তো আরো নতুনত্ব নিয়ে এসেছে, আরো কল্যাণ নিয়ে এসেছে, যা পূর্বের গুলোয় ছিলো না। আবার পূর্বের সংস্করণে এমন কিছু ছিলো, তা এখন নতুন প্রজন্মের কারো জন্য প্রযোজ্য না, সেই বিবেচনায় নির্মতা সেসব বাগ দেখিয়ে ফিক্স করে দিয়েছেন। কোথায় কখন কি পরিবর্তন হবে বা না হবে, তা তো কেবল নির্মাতাই জানে। মাঝখানে আমরা কেবল চিৎকার-চেচামেচি করতে পারি অনর্থক।


হ্যা, আমি জেনে বুঝে কথাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তবেই নতুনের সাথে মানিয়ে নেয়াকে বলছি, শোনা মাত্র দৌড় দেয়াকে নয়। সে জানবে এটা কি তার স্রষ্টার পক্ষ থেকে পরিবর্তন, নাকি কোনো মানুষের দ্বারা পরিবর্তন; না সেই শয়তানের দ্বারা, যে নিজেই অভিশপ্তদের স্রষ্টা। এসব যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে তাকে তার স্রষ্টার পরিবর্তনে নিজেকে মানিয়ে পরিবর্তনের স্বাদ নিতে হবে। কিন্তু মানুষ যেহেতু স্রষ্টার একটি ওপের সোর্স, সেহেতু তার ইচ্ছে স্বাধীনতাকে প্রধান প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সে কি নতুনে স্থানান্তর হবে, নাকি পুরোনোতে থাকবে, তা তার ইচ্ছে। তবে পুরোনোতে থাকতে থাকতে যখন অধিক পুরোনো হয়ে যাবে, তখন থেকে খানিক সমস্যার সমুখীন স্বাভাবিক ভাবেই হতে হবে।


বলার বিষয় হচ্ছে স্রষ্টা মানব স্রষ্টার মতো ব্যবসায়ী স্বার্থের ন্যায় কোনো স্বার্থের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত সীমিত সময় সীমা দেয়নি, দিয়েছে একটি সুবিশাল সময়। তা কেবল পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয় অবধি। যা হচ্ছে সামষ্টিক সময়। এ সত্ত্বে পুরোনো হওয়ার দায়ে আপনার দৈহিক ডিভাইসের কোনো সমস্যা হবে না, আপনি আরো স্বাভাবিক চলাচল করতে পারবেন সমগ্র সৃষ্টির মেয়াদ শেষে কেয়ামত সংগঠিত পর্যন্ত। এরপর পুরোনো সংস্করণ আপনার মাদারবোর্ডে আর কাজ করবে না। মানে পুরোনো ধর্ম একমাত্র তখনই আপনার রূহের কাজে অকেজো হয়ে পরবে। তবে একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সামষ্টিক হিসেবে মানবসভ্যতা যতোদিন টিকবে, ততোদিন এই সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও, ব্যক্তি পর্যায়ে এ সুযোগ আপনার আয়ু আছে যতোদিন। সেই সময়টা ঐ সময় থেকে নিশ্চয়ই সীমিত। তবে এ ক্ষেত্রেও লাইফটাইম সময়। এই সময়টা রূহ কবজের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত পাচ্ছেন।


এখানে আপনার চিন্তার বোধদয় হচ্ছে কি? ব্যাকডেটেড হওয়ার পরও সবকিছুর স্রষ্টা আপনাকে কতো সুবিশাল সময় দিচ্ছে, যা মানব স্রষ্টা আপনাকে কৃত্তিম বৈজ্ঞানিক নির্ধারিত আবিস্কারের ক্ষেত্রে দেয় না। বৈজ্ঞানিক ওপেনসোর্স সিস্টেম মানে আপনার কমান্ড বা হাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে সেই সৃষ্টিকে ভালোমন্দ যাচ্ছে সুযোগ দেয় না। তাকে যে কাজে তৈরি করেছে, সে পর্যন্ত তার ক্ষমতা দেয়া হয়। অতি সামন্য ব্যাপার তার নিয়ন্ত্রণে, বাকি পুরোটাই স্রষ্টা বা আপনার হাতে রেখে দেয়। সে মুক্ত হিসেবেও অসম্পূর্ণ। অথচ আমাদের স্রষ্টা আমাদের করেছে মু্ক্ত হতে অধিক মু্ক্ত। যাচ্ছে ভাবার স্বাধীনতা, করার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা সব নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। স্রষ্টা ধর্মে ধর্মে নতুন সংস্করণ নিয়ে আসলেও আপনাকে সেকেলে বলে ফেলে দেয় না। কারণ সে আমাদের সীমাবদ্ধতার ন্যায় সৃষ্টিকে মুক্ত করেনি। তিনি অসীম এবং ব্যাপক। তার সৃষ্টিকেও করেছেন ব্যাপক স্বাধীন। যেনো তা সীমাবদ্ধতার প্রশ্নোর্ধ্বে থাকে। আপনি অজ্ঞতা বা অক্ষমতার দরুন নতুনের সাথে খাপখাইয়ে নিতে পারেন নি, তার জন্য স্রষ্টার ধারাবাহিক পরিবর্তন সাম্প্রদায়িকতা হতে পারে না। যেমন হয় না আপনার টাকার অপব্যয়ে নতুন ডিভাইসে আসা, নতুন ডিভাইসের অভাবে পুরাতনের বঞ্চিত আচরণে নির্মতার দায়। যেমন হয় না আপনার পুরোনো সভ্যতার প্রেমে নতুন সভ্যতায় অসামাজিক হওয়ায় সভ্যতা পরিবর্তনকারীর দায়। আপনার অজ্ঞতায় তাদের সাম্প্রদায়িক আখ্যায়িত যুক্তি যেমন জ্ঞানহীন পাগলামো, তেমনি মুক্তমনা দাবির যু্ক্তিতে স্রষ্টার পরিবর্তনের ধারা বা ধর্মের ধারাবাহিকতায় স্রষ্টাকে সাম্প্রদায়িক বলা তেমনই মুর্খতা। পরিবর্তনের ধারা আছে বলেই পৃথিবী আজো ক্রম পরিবর্তনের ধারায় এগিয়ে চলছে।


মানুষ অজ্ঞতায় থেকে ধার্মিক দাবি করে ধর্মের অনেক অপব্যবহার করতেই পারে, ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসায়ে নামতে পারে, বিজ্ঞানের সাথে জড়িত নন তবু বিজ্ঞান মনস্ক দাবি করতেই পারে, কিংবা বিজ্ঞানের বুলি আওড়ে অপব্যবহারে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি সেরে নিতে পারে; তাতে না ধর্মের কিছু আসে-যায়, না বিজ্ঞানের। বস্তুত ধর্ম ও বিজ্ঞানের সামান্য জানার সীমাবদ্ধতায় মানুষ বাড়াবাড়ির মাধ্যমে অজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছে, তা সে সকল মানুষের ব্যর্থতা। ধর্ম, বিজ্ঞান বা এসবের স্রষ্টার কোনো দায় থাকতে পারে না। ধর্ম ও বিজ্ঞান হচ্ছে সমুদয় জ্ঞানের ভাণ্ডার। বিজ্ঞানী কিংবা সকল কিছুর স্রষ্টা তার সংস্করণ গুলো সম্পর্কে ব্যাপক চর্চায় মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, তাতে আমরা ধার্মিক বা বিজ্ঞান মনস্ক দাবিদার জ্ঞানের অল্প পানিতে নেমে দাপিয়ে বেড়ালে স্রষ্টার কি আসে-যায়! অথচ এক পক্ষ অপর পক্ষের কার্যকলাপে অযথাই দায় চাপিয়ে যাই স্রষ্টার ঘাড়ে। পরিশেষে মানুষের সাম্প্রদায়িক আচরণে সাম্প্রদায়িক হয়ে যায় স্রষ্টা।
ধর্মের পর ধর্মে স্রষ্টা সাম্প্রদায়িকতা চেয়েছেন!

মুহাম্মদ উমর ফরহাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *