February 25, 2024

জল পরি নাকি জল কাহিনী – ফারহানা শিখা

মৎস্যকন্যা বা জলপরী বা মারমেইড যাই বলিনা কেনো এই ঐতিহাসিক রহস্যময় প্রাণীকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কিন্তু সব কৌতূহল কিছু প্রশ্নে গিয়ে এতো জটলা বাঁধিয়ে ফেলে। পাশাপাশি আমরা রূপকথার গল্পকে ঠিক যতটা সুন্দর করে কল্পনা করি, বাস্তবতা কি অতটাই সুন্দর হয় বলে আপনার ধারণা?

আজ আপনাদের জানা অজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিব।সচরাচর ভিডিও গুলোতে দেখা একঘেয়েমি তথ্য গুলোর বাহিরে যাবো আমরা আজ। মনোযোগ দিয়ে পড়ুন…….

১. মৎস্যকন্যা কি? এর ইতিহাস কি? কিভাবে এই উদ্ভট প্রাণী মানুষের কল্পনায় বাসা বাঁধলো?

___ তাহলে ফিরে যেতে হবে আরও হাজার বছর আগে। যখন মানুষ মাত্রই জাহাজ বানিয়ে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছে। যেখানে এখনও মানুষ ভূমির ৫০% ও আবিষ্কার করতে পারেনি সেখানেই পানির যাত্রা আর অভিজ্ঞতা তাদের কাছে পুরোই নতুন। তখনকার মানুষ এতটাও কল্পনা বিলাসী ছিলনা যে মৎস্যকন্যার মতো জীবকে কল্পনায় বানিয়ে ফেলবে আর পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে তাও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া। একজনের কল্পনা দিয়ে নিশ্চই এতো বড়ো একটা কিংবদন্তির সৃষ্টি হয়নি? তাহলে কিভাবে হলো?

__ প্রথম এই মৎস্যকন্যার কাহিনী পাওয়া যায় ব্যাবিলনীয় এক নথিতে। যেখানে অর্ধেক মাছ ও অর্ধেক মানব আকৃতির জীবের কথা উল্লেখ করা আছে। তারপর আসে গ্রীক সভ্যতার উপকথা। তারপর রোমান সাম্রাজ্য। রোমান সভ্যতার বিখ্যাত লেখক (pliny the elder) এর লেখা বই (natural history) যেখানে তিনি এমন অর্ধেক মাছ ও অর্ধেক মানুষ আকৃতির জীবের কথা উল্লেখ করেন। প্লিনি নিজে যদিও এই জীবকে কখনো দেখেন নি তবে তিনি অনেকের কথা নিজের বইতে উল্লেখ করেছেন যারা মৎসকন্যা দেখেছে বলে দাবি করে।

__ জানুয়ারি ১৪৯৩ সাল। যখন কলম্বাস সমুদ্রযাত্রার ছিলেন তেমনি একরাতে তিনি তিনটে মৎস্য কন্যা দেখেছেন বলে দাবি করেন। তবে তিনি এটাও বলেন যে যেভাবে মৎসকন্যা দেরকে যুগে যুগে বিশ্ব সৌন্দর্যের অধিকারী বলে দাবি করা হয় আসলে তারা অতটা সুন্দর না। তিনি বলেছিলেন তার দেখা তিনটে মৎসকন্যা ছিলো খুব বিদঘুটে দেখতে , তাদের চেহারার চামড়ায় ভাঁজ পড়া ছিল অনেক আর দেখতে অনেকটা কোনো বন্য প্রাণীর মতো দেখতে।
তার এই কথাটা যদিও মানুষ বিশ্বাস করেনি। তাই তার দেখা ওই দৃশ্য আর তার গল্প নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

__ ১৫ জুন ১৬০৮ সাল। হেনরি হাডসন নামক এক ব্যক্তির সদস্যরা যারা জাহাজে ছিলো তারাও মৎসকন্যা দেখার দাবি করে।

__ ১৮৭০,১৮৯০, ১৯৬৭ সালেও এই জীবকে দেখার খবর আসে। এক জেলে ১৮৮১ সালে পাঁচ জায়গায় মৎসকন্যা দেখেছেন বলে জানিয়েছিলেন। এমনি সময় সময়ে মানুষ এই রহস্যময় জীবকে দেখেছে বলে দাবি করলেও আমাদের কাছে এখনো স্পষ্ট না আসলেই এই প্রাণীটা বাস্তবে আছে নাকি শুধুই রূপকথার ভাগীদার।

২. মৎসকন্যা যদি থেকেও থাকে তাহলে তারা কোথায়? আর তাদের অস্তিত্ব সত্য কিনা?

__ তারা হয়তো গভীর সমুদ্রে থাকে। আর লক্ষ বছর আগে তো ডাইনাসর ও ছিলো। কিন্তু তারা এখন বিলুপ্ত। হয়তো এরাও আগে ছিল … কিন্তু এখন বিলুপ্ত বা বিবর্তনে ভিন্ন গঠনের হয়ে গেছে।

৩. এরা দেখতে কি কল্পনার মতই সুন্দর?

___ নাহ। কোনো গভীর সমুদ্রের প্রাণী দেখতে আমাদের মত সুন্দর আর আকর্ষণীয় হবে এটা ভাবেন কীকরে? আমাজন এর মানুষদের কে দেখেন , আর আমাদেরকে দেখেন। ডাঙায় বাস করে তবুও কত পার্থক্য! আর এরা তো সমুদ্রের গভীরে থাকে। তাহলে এরা আমাদের মত হবে ভাবেন কীকরে? এবার তাদের রূপের বর্ণনা দিবো একটু ধৈর্য সহ শুনবেন।
.
.
এবারে আমি কিছু স্টাডি ও যুক্তি দেখাই আপনাদের যে এই প্রাণীদের ঠিক কেমন হওয়া উচিত।

১. সমুদ্রের যত গভীরে যাবেন ততই অক্সিজেন এর মাত্রা কমতে থাকে আর পানিতে মিশ্রিত অন্যান্য পদার্থের মাত্রা বাড়তে থাকে। ফলে নিশ্চই তারা মানুষের মতো শ্বাস প্রশ্বাস এর ক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করেনা। বা করলেও অন্যভাবে।

২. সমুদ্রের তলদেশে যতই যাওয়া যায় ততই পানির চাপ বাড়তে থাকে। অর্থাৎ আপনার দেহের উপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করবে পানির ঘনত্ব যার কারণে আপনি এক মুহুর্ত স্থির থাকতে পারবেন না পাশাপাশি শ্বাস কষ্ট হওয়া অস্বস্তি হওয়া তো আছেই। তাই সাবমেরিন একটা নির্দিষ্ট গভীরতার পর আর যেতে পারেনা। নাহলে পানির ঘনত্বের চাপে সেই সাবমেরিন ও ভেঙে যেতে পারে।
তাহলে এই গভীরতার জীবগুলো শারীরিক গঠন হতে হবে আরও মজবুত বা চাপ সহনশীল। যাতে তারা সহজেই চলাফেরা করতে পারে আর অত্যধিক চাপের কারণে খণ্ড বিখণ্ড না হয়ে যায়।

৩. সমুদ্রের (২০০–১০০০ ) মিটার নিচে সূর্যের আলো পৌঁছোয় না ফলে সেখানে অন্ধকার ও এতই ঘন যে সেই পরিস্থিতিতে কিছু দেখতে হলে প্রাণীদের ভিন্ন গঠনের হতে হবে।

যেমন গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের উপর রিসার্চ করে জানা গেছে তাদের চোখের আকৃতি স্বাভাবিকের থেকে বড়ো হয়। আর চোখের মধ্যে (রড কোষের পরিমাণ বেশি থাকে) এই কোষগুলো আমাদের কে রাতের আধারে দেখতে সাহায্য করে। ফলে এই কোষগুলো বেশি থাকা অর্থাৎ তারা ওই গভীরেও যেনো সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পারে।

৪. গভীরে থাকা অনেক প্রাণীর ঘ্রাণ শক্তি প্রখর থাকে। ফলে পানিতে ভেসে বেড়ানো ক্ষুদ্র কণা বা খাদ্যবস্তু বা কিছু এলেই তারা দ্রুত বুঝে যায়।

৫. যেহেতু ওই গভীরতায় খাদ্যের অভাব , তাই গভীরে উপস্থিত প্রাণীদের আরো একটা বৈশিষ্ট্য থাকে যে তারা দীর্ঘসময় খাদ্য না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারে। যেমন উট নিজের পিঠের চর্বিতে পানি সঞ্চয় করে রাখে। তেমনি এরাও অনেকদিন বেঁচে থাকতে পারে। আর এদের দৈহিক গঠন এমন হয় যে খুব কম মাত্রার অক্সিজেন নিয়েও এরা বাঁচতে পারে।

৬. গভীরে উপস্থিত প্রাণীদের আরো একটা বৈশিষ্ট্য , তারা আকারে অনেক বড়ো হয়। এদের গায়ের রং খুব বর্ণধারি(colorful) হয়না। অনেকটা কালশিটে বা ফ্যাকাসে রংটাই বেশি।

তাহলে এতগুলো তথ্য থেকে কি বলা যায়?
যদি মৎসকন্যা থেকে থাকে তাও গভীর সমুদ্রে তাহলে তাদের গঠন ঠিক উপরের তথ্যানুসারে হবে। চাপ সহনশীল দেহ, দেহের বর্ণ ও ভিন্ন (অবশ্যই আমাদের মত রূপবতী হবেনা) চোখগুলো বড়ো, আরো অন্যান্য বিষয়। তাই যদি কলম্বাস বলে থাকেন যে জলপরী গুলো এতটা সুন্দর না উল্টো ভয়ানক দেখতে তাহলে তিনি খুব ভুল কিছু বলেননি। তাই কল্পনার সেই সুন্দরী মৎসকন্যা দের চিন্তা করা বন্ধ করে বাস্তবতা দিয়ে ভাবুন। তারা দেখতে অতটা ও সুন্দর হয়না। আর তারা নিশ্চই মানুষের মতো কথা বলতে পারবেনা। যেহেতু তাদের পরিবেশ এমন নয়।

আরেক গবেষণায় বলা হয় , গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের যদি উঠিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ এ বা ভিন্ন পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয় তবে তাদের দেহের প্রোটিন ভেঙে যায় এমনকি দেহে ভেতরের অঙ্গানু গুলো ফেটে বেরিয়ে আসে। যেহেতু তারা অত্যধিক চাপ সহনশীল পরিবেশে থাকে তাই নিম্নচাপে তারা বাঁচতে পারেনা। যেমনটা আমরা নিম্নচাপের মানুষ উচ্চচাপ এ বাচতে পারবো না। তাই আমি ভাবি মৎসকন্যা দেরকে যে অনেকেই দেখেছে অর্থাৎ তারা হয়তো খুব গভীরে থাকেনা। নইলে তারা দ্বীপে বা পাথরের গায়ে উঠলেই তো ভিন্ন পরিবেশের কারণে মারা যেত তখনি।

এখন পর্যন্ত মানুষ সমুদ্রের মাত্র ৪% সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে। বাকি ৯৬% এ যে অনেক অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে তা বলার বাকি থাকেনা। তবে এখনও মৎসকন্যা র অস্তিত্ব বিজ্ঞান স্বীকার করেনা। তাই বলা যায়না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *