March 2, 2024

জর্জ অরওয়েল – মাহমুদ মেনন

ধরুন – আপনার রাষ্ট্রে সর্বেসর্বা একটি মাত্র দল বা পার্টি । তাঁদের মতাদর্শের থেকে ভিন্ন কোনো কিছুর কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই । দলের ক্ষমতা Absolute, নিরঙ্কুশ, অসীম এবং সকল প্রশ্নের উর্দ্ধে !
.
ধরুন – দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান ঈশ্বর-সমান । তিনিই সর্বেসর্বা, Absolute, তিনিই একক এবং নিরঙ্কুশ ।
.
ধরুন – আপনার বাসায় রুমে বসানো আছে এমন একখানা যন্ত্র যা দিয়ে আপনাকে প্রতিমূহুর্তে নজরে রাখা হয় । প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা নি:শ্বাসে খেয়াল রাখা হয় । আপনি কি খাচ্ছেন, পড়ছেন, পরছেন, লিখছেন সব দেখা হয়, শোনা হয় ।
.
ধরুন – আপনার অফিসেও বসানো আছে একই যন্ত্র যা দিয়ে আপনার প্রতিটি কাজ, কথা, আলোচনা, ডিল তীক্ষ্ণ নজরে রাখা হয় ।
.
ধরুন – আপনার শহরে প্রতিটা জায়গায় বসানো আছে এমন যন্ত্র যা আপনার প্রতিটা চলাফেরা, কার সাথে মিশছেন, কথা বলছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কি খাচ্ছেন তা নজরে রাখা হয় ।
.
ধরুন – নজর রাখা হয় আপনার প্রতিটা ফোনকল, মেসেজ, ইমেইল সবকিছুতেই ।
.
ধরুন – আরও আছে ‘থট পুলিশ’, যারা আপনার চিন্তা-ভাবনাকে পড়তে পারে, চিন্তার অপরাধও ধরতে পারে ।
আপনার কথায়, কাজে, চিন্তায়, চলাফেরায়, আচার-আচরণে কোনোরকম কোন সন্দেহ দেখা দিলেই গভীর রাতে বাসায় এসে আপনাকে তুলে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী । তারপর আপনি শ্রেফ গুম হয়ে যান চিরজীবনের তরে ! আপনাকে বাষ্পীভুত করে দেয়া হয় !
.
ধরুন – নিয়ম করে পালন করা হয় ঘৃণা-ঘন্টা কিংবা ঘৃণা-সপ্তাহ, যেখানে দলের সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদের উদ্দেশ্যে মানুষের মনে তীব্র ঘৃণা এবং জিঘাংসা জাগিয়ে তোলা হয় সিস্টেমেটিক উপায়ে ।
.
ধরুন – বিনোদন বলতে বোঝানো হয় সত্যিকারের যুদ্ধের ভিডিও প্রদর্শনী । কিভাবে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে প্রতিপক্ষের হাত-পা-মাথা-মগজ, কিভাবে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হচ্ছে কোলের বাচ্চাটিকে, কিভাবে নৌকা ডুবিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে শত শত মানুষগুলোকে সেগুলোর সত্যিকারের দৃশ্যই সিনেমা ! আরও আছে প্রতিমাসে শহরে আয়োজন করা ফাঁসির উৎসব । ছেলে-বুড়ো-বাচ্চা সবাই সেখানে দেখতে যেতে বাধ্য । দেখে দর্শক বিনোদিত হয়, উত্তেজিত হয়, আনন্দ পায় ।
.
ধরুন – লাগাতার প্রচারিত হচ্ছে মিথ্যে পরিসংখ্যান, যেখানে বলা হচ্ছে দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, উৎপাদন সব কিছু বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে; যদিও বাস্তবে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, রেশনের পরিমান প্রতিমাসে কমেই চলেছে ।
.
ধরুন – প্রতিনিয়ত বদলে দেয়া হচ্ছে অতীতকে । অতীতের সমস্ত খবরের কাগজ, বই, রেকর্ড সবকিছু লেখা হচ্ছে নতুন করে, পাল্টে দিয়ে । ধরে ধরে বাষ্পীভুত করে ফেলা হচ্ছে বয়ষ্ক মানুষদেরকে, যাঁদের মস্তিষ্কের স্মৃতিতে এখনও বেঁচে আছে কিছুমাত্র সত্যি অতীত ।
.
ধরুন – ভালবাসা, নারী-পুরুষের স্বাভাবিক চিরন্তন আকর্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ । দলের প্রতি একচ্ছত্র নিবেদন ছাড়া আর যেকোনো ধরণের অনুভূতি শাস্তিযোগ্য় অপরাধ ! এবং তার শাস্তি বাষ্পীভূত হওয়া ।
.
ধরুন – বদলে ফেলা হচ্ছে ভাষাকেও । বাদ দেয়া হচ্ছে স্বাধীনতা, উদারতা, মুক্ত – এমন শব্দগুলো, যেন চিন্তার পরিধিটা যতটা সম্ভব ছোট করে আনা যায় । মানুষ যখন এসমস্ত শব্দই চিনবেনা, জানবেনা, তখন এগুলো নিয়ে চিন্তাও করতে পারবে না ।
.
কি আমাদের চারপাশের সাথে কিছুটা পরিচিত লাগছে ?
.
নাহ্, গল্পটা ইংরেজ লেখক-সাংবাদিক জর্জ অরওয়েলের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘Nineteen Eighty-Four (1984)’
.
ঈদের ছুটিতে শেষ করলাম ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত এই অতিবিখ্যাত Dystopian Social Science Fiction উপন্যাস খানা । ‘ঐতিহ্য’ থেকে প্রকাশিত ‘মাহমুদ মেনন’ এর অনুবাদ । স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনা-ভাবনার একদম বিপরীতে লেখা হয়েছে এটি । পড়তে গিয়ে বারবারই মাথা ভার হয়ে এসেছে, চাপ অনুভব করেছি । এতখানি ভয়াবহ বিপরীত চিন্তা-চেতনা অন্ত:ত আমার মাথায় সহ্য করতে কষ্ট হয়েছে । কিছু পাতা পড়ার পরেই একটা করে ৫-১০ মিনিটের ব্রেক নিয়েছি । তারপর আবার পড়া শুরু করেছি । এভাবে বইটি ৩২০ পাতার বইখানা শেষ করেছি ৩ দিনে ।
.
লেখক জর্জ অরওয়েল ১৯৪৯ সালে বসে আসছে সময়ের যে ভয়াবহ রাজনৈতিক নিষ্পেষণের ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছেন, তা সাদাচোখে অনেকখানি বাড়াবাড়ি মনে হলেও আসলে কি খুব কষ্ট কল্পনা ? Mobile phone-Computer-Smart speaker-Personal assistant নামক যন্ত্রগুলোর মাধ্যমে এখন কি আমাদের সমস্ত কথা, লেখা, মেসেজ, ইমেইল, চলাফেরা সবই শোনা হচ্ছে না, দেখা হচ্ছে না, Track করে হচ্ছে না ? চরম একনায়ককেন্দ্রীক কিংবা কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থায় পৃথিবীর অনেক দেশের পরিস্থিতিই কি এর কাছাকাছি নয় ? তথাকথিত অনেক গণতান্ত্রিক দেশের অবস্থাও কি খুব আলাদা কিছু ?
.
নাগরিকদের উপর তীক্ষ্ণ নজরধারী, আড়িপাতা, ভিন্নমত পোষণকারীদের উপর অত্যাচার-গুম করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কড়াকড়ি, সবসময় কোনো না কোনো দেশ-ধর্মবিশ্বাস-গোষ্ঠীকে শত্রু বানিয়ে নাগরিকদের দৃষ্টি তার উপর রাখা, মিথ্যা পরিসংখ্যান, শিল্প-সাহিত্যের উপর দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য রাজনৈতিক সেন্সরশীপ – এসব কিছু কিন্তু খুব ভাল ভাবেই আছে – অনেক দেশে, আমাদের আশেপাশেও ।
.
নাগরিকদের উপর তীক্ষ্ণ নজরধারী, আড়িপাতা, ভিন্নমত পোষণকারীদের উপর অত্যাচার-গুম করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কড়াকড়ি, সবসময় কোনো না কোনো দেশ-ধর্মবিশ্বাস-গোষ্ঠীকে শত্রু বানিয়ে নাগরিকদের দৃষ্টি তার উপর রাখা, মিথ্যা পরিসংখ্যান, শিল্প-সাহিত্যের উপর দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য রাজনৈতিক সেন্সরশীপ – এসব কিছু কিন্তু খুব ভাল ভাবেই আছে – অনেক দেশে, আমাদের আশেপাশেও ।
.
ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও বেশী ১৯৮৪’র কাছাকাছি যাবে কি না, না কি আরও দূরে যাবে তা কেবল মাত্র সময়ই বলে দিবে । তবে ২০২২ এ বসে প্রায় ৭৩ বছর আগের করা ভবিষ্যৎবাণীর অনেক কিছুই আমি মিলে যেতে দেখছি ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *