February 26, 2024

এল ডোরাডো ট্রিলজি – আমিনুল ইসলাম।

বিটা রিডিং রিভিউ “এল ডোরাডো ট্রিলজি”
লেখক: আমিনুল ইসলাম।

প্রথম বই “এল ডোরাডো”র বিটা রিডিং করেছিলাম। একই ফ্লাটের কয়েজন টিনেজার ছেলেমেয়ে আছে, মাঝে মাঝেই আমার কাছ থেকে এটা সেটা বই নিয়ে পড়তো। ওদের এই “এল ডোরাডো” বইয়ের নামের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল, একে একে সবাই নিয়ে পড়েছে। তো মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করতো, আপু পরের বই গুলো কবে কিনবেন? মিথ্যা বলবো না আমি নিজেও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। নিচে কাহিনী সংক্ষেপ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

১. এল ডোরাডো।
বইয়ের প্রোটাগনিস্ট আয়ান নিজের অনিচ্ছায় ডাক্তারি পড়ছে। এরই মাঝে হঠাৎ জানতে পারে তার সুস্থ সবল মায়ের অকাল মৃত্যুর কথা। অন্তিম সৎকার শেষে মায়ের ইচ্ছা পূর্ণ করা বা নিজের শখের টানে পাড়ি জমাতে ছোটে পরদেশে। কিন্তু বিপদ তখনও পিছু ছাড়েনি। প্লেন দুর্ঘটনায় সাগরে গিয়ে পড়লো ছেলেটা। চারিদিকে মৃত্যুর আর্তনাদ ছাপিয়ে জ্ঞান হারিয়ে জীবনের প্রতি আর কোনোই আশা যখন অবশিষ্ট নেই তখন দৈবিক ভাবে জ্ঞান ফিরলো অজানা অচেনা এক দ্বীপে। কিন্তু সময়টা কেমন যেন অস্বাভাবিক। ইতিমধ্যেই আবিস্কার করেছে এটা শত শত বছর অতীতের কোন এক সময়। তখন চারিদিকে উত্তাল সামুদ্রিক ঢেউ, “আই আই ক্যাপ্টেন!” বলে আদেশ পালন করছে জাহাজের ক্রুরা। উমহু, আমাদের সময়ের অত্যাধুনিক কোন জাহাজ নয়। বরং প্রায় শ’পাঁচেক বা তাও বেশি সময় আগের ক্যারিবিয়ান এলাকার জলদস্যুদের জাহাজ। ঢাল তলোয়ার, গোলাবারুদ আর উত্তেজিত জলদস্যুদের চিৎকার।

পরিস্থিতির সাথে কোনভাবেই মানিয়ে নেওয়ার উপায় নেই আয়ানের। অথচ ওর জন্মেরও নাকি একটা উদ্দেশ্য আছে, আর তা হলো “এল ডোরাডো”। আমাজনের বুকে হারানো স্বর্ণের শহর “এল ডোরাডো”। এটা খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই নাকি মুক্তি মিলবে সময়ের এই মার প্যাচ থেকে। কিন্তু এটা তো একটা মিথ, কিংবদন্তি অথবা আরও ভালো করে বললে লোকমুখে ছড়ানো গাল গপ্পো। যেই গাল গপ্পের পাল্লায় পড়ে দুর্ধর্ষ নাবিকেরাও পরাস্থ হয়েছে, সেটা কীভাবে খুঁজে পাবে আয়ান!

এল ডোরাডো একটা অভিযান, আয়ানের অভিজান। এই অভিজানে ওর সঙ্গী হয় আরও দুজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হ্যামিল্টন এবং টরেস। তাছাড়া আরও কিছু চরিত্র আছে পাশাপাশি যেগুলো গল্পের সাথে সাথে চলে আসবে। জলদস্যুদের জীবন জীবিকা, উত্থান পতন, প্রেম, মোহ, নিষ্ঠুরতা যেভাবে ফুটে উঠেছে সেটার জন্য বেশ প্রশংসা প্রাপ্য লেখকের। এছাড়া সাগর, আর গহীন অন্ধকার আমাজনের মধ্যেকার টান টান উত্তেজনা অ্যাডভেঞ্চার এগুলো সকল বয়সিদেরই রোম্যাঞ্চিত করবে। বিশেষ করে টিনেজ বয়সিদের বেশি আকৃষ্ট করবে এগুলো।

২. এল ডোরাডো কার্স।
নাম শুনেই বোঝা যায় অভিশাপ সম্পর্কিত কিছু। হ্যাঁ, আসলেই অভিশাপ। প্রথম বইটি অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর হলেও দ্বিতীয় বইটাকে হাই ফ্যান্টাসি বললেও ভুল হবে না। দ্বিতীয় বইতে আছে পুরো একটা অন্যজগৎ, নাম ক্যালিদিয়া। সেখানে আছে প্রথম শ্রেণির দেবতা থেকে শুরু করে নানান দেবতা, আছে অপদেবতা। মেউক নামের একরকম দানব আছে সেই জগতে, যারা কয়েক বছর পর পর ক্যালিদিয়ার বিভিন্ন গ্রাম তছনছ করে দেয়, মারা যায় অসংখ্য মানুষ। তারা সাহায্য চায় দেবতাদের কাছে, দেবতারাও তাদের সাহায্য করে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে ক্যালিদিয়া আমাদের পৃথিবীতেই অবস্থিত। প্রশ্ন হতে পারে এই যে দেব দেবী, জাদু ক্ষমতা, দানব, অসুর এরা তাহলে কোথা থেকে এলো?

হাই ফ্যান্টাসি বই মানেই নতুন এক জগৎ, যেই জগতের মিথ থাকবে, ইতিহাস থাকবে, আলাদা ধর্ম, ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশ থাকবে। ক্যালিদিয়াতেও তাই আছে৷ এগুলো আসলে এক কথায় বলা যায় না। তবে ফ্যান্টাসি কিছু এলিমেন্ট নিয়ে কথা বলতেই পারি “এল ডোরাডো” কার্স নিয়ে।

দেবতা ও অপদেবতা: এল ডোরাডো কার্স বইতে দেবতা এবং অপদেবতার ব্যাপারটাই জোড়ালো। আসলে দেবতা কেন দেবতা হয়? আর অপদেবতারই বা কেন হয়, ধ্বংসের আড়ালে অপদেবতার উদ্দেশ্য কী থাকে? যারাই দেবতা তারা মানুষের পাশেই কেন বসবাস করে, আর করলেও তাদের মাঝে মানবিক অনুভূতি কতটুকু আছে। ক্যালিদিয়ায় এই দেবতাদের ব্যাপার গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর লোককথায় আছে, আগে নাকি আরও অনেক দেবদেবী ছিলো, তারা কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। কোথায় তা কেউ জানে না।

মেউক: মেউক হচ্ছে এক ধরনের মন্সটার, যারা বংশবৃদ্ধি করে। আকারে বিশাল হতে পারে, প্রায় ২০/৩০ ফুটের মতো। দেখতে মানুষের আকৃতির, কিন্তু দুই হাতের স্থলে চার হাত হয়, থকথকে আর কালচে, মাংসাশী প্রাণী এটি। ক্যালিদিয়ার লোককথা অনুযায়ী এদের কোন এক অপদেবতা সৃষ্টি করেছিলো ক্যালিদিয়া ধ্বংস করার জন্য। আর দেবতারা তাদের সব সময় মেউকদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে।

রিনার: এরা মুলত এক যোদ্ধা দল। গোল এক ধরনের চাকতির উপরে দাঁড়িয়ে এরা খুবই দ্রুত গতিতে উড়ে বেড়াতে পারে। এদের কপালে টিপের মতো রিন পরানো থাকে। এর সাহায্য নিয়ে ওই চাকতি তাদের দেহের অংশ হয়ে যায়, আর মস্তিষ্কের সাহায্যে ওসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এরা দেবতাদের পক্ষের যোদ্ধা।

কালোহেম বাহিনী: এদের বলা হয় অপদেবতার পক্ষের যোদ্ধা বাহিনী। এদের পোশাক কালো। অন্ধকার এক জঙ্গলের গহীনে তাদের অবস্থান। এই দলকে নিয়ে অনেক কন্সপিরেসি প্রচলিত আছে ক্যালিদিয়াবাসিদের মনে। জমের মতো ভয় পায় বলেই কেউ এদের সামনে পড়তে চায় না।

সব মিলায়া বলতে গেলে পাঠক হিসেবে যা যা চেয়েছি তার চেয়ে বেশিই আছে বইটাতে। ছোট বড় সবারই ভালো লাগার কথা।

৩. অ্যা ফেস্টিভ্যাল অব ব্লাড & সি।
এই বইটাতে আবার দেখানো হয়েছে জলদস্যুদের কিছু জীবনি এবং প্রথম বইয়ের কিছু চরিত্রের জীবনে ঘটে যাওয়া অসমাপ্ত গল্পের সমাপ্তি। যেমন প্রথম বইতে দেখানো হয়েছিলো মারিয়ার অবৈধ সন্তান মারা যাওয়ার পর চার্চের হাতে ধরা পড়ে সে, তখন কী হয় তার সাথে, প্রেমিক ব্যালেমির খোঁজ সে পেয়েছিল কিনা এটা। পাশাপাশি জাহাজে বাড়ি ফেরার পথে সোফিয়াদের জাহাজ জলদস্যু হ্যানসনের সিরিয়াস জাহাজের হাতে ধরা পরার পর সোফিয়া রেপ হয়, ওর চোখের সামনে বাবা আর ভাইকে হত্যা করা হয়, এর পর সোফিয়ার কী হয়। তৃতীয় বইতে এটাও দেখানো হয়েছে।

তবে তৃতীয় বইয়ের মূল ব্যাপার হচ্ছে ক্যাপ্টেন সান্ডারের উত্থানকে নিয়ে। এখানে সেটাও দেখানো হয়। এছাড়াও এই বইতে আরও একটা সেকেন্ডারি জগত দেখানো হয় প্রাইমারি জগতের পাশাপাশি, আটলান্টাস। এখানে কিন্তু ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস, এনিমেল, প্রজাতি তো আছেই। সেই সাথে আছে জাদুকর আর অপজাদুকরদের লড়াই।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলা ফ্যান্টাসি এবং অ্যাডভেঞ্চারের মিশ্রিত বইটি ভালো লেগেছে৷ ছোট বেলায় এই ধরনের বই পড়তাম সেই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার একটা স্বাদও পেয়েছি। মানে ছোট বেলার ফ্লেভারে বড়দের অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ। তিনটি বই একে অন্যের থেকে ভিন্ন প্লটে লেখা হলেও একই কাহিনির সুত্র ধরে এগিয়েছে৷

ওভার অল পাঠপ্রতিক্রিয়া: ব্যক্তিগত ভাবে রোম্যাঞ্চকর অভিযান আমার বেশ পছন্দ। ছোট বেলায় এই ধরনের বই পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যাবার অবস্থা হয়ে যেত। সেখানে এল ডোরাডো ট্রিলজির প্রথম এবং তৃতীয় বইটা পুরোটাই এমন সামুদ্রিক অভিযান, জলদস্যুদের জীবনের উপরে হওয়ার আমার বেশ ভালো লেগেছে। তাছাড়া ফ্যান্টাসি জনরা বরাবর পছন্দ, যার জন্য দ্বিতীয় বইয়ের হাই ফ্যান্টাসি জগতে যে গল্পটা আছে ওটাও ভালো লেগেছে। আর ইদানীং আমি নিজেই মনস্তাত্ত্বিকতা নিয়ে কাজ করার কারণে তৃতীয় বইয়ের দ্বন্দ্ব গুলো ওভাবে রিলেট করতে পারিনি।

যারা স্লোবার্ন পছন্দ করেন না, বা সরাসরি কাহিনীতে চলে যেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই বইটা মাস্ট রিড। কারণ প্রথম ১০/১২ পেজের মধ্যেই হুক পেয়ে যাবেন, যা টেনে নিয়ে যাবে বইয়ের শেষ অবধি। লেখার মধ্যে অতিকথন নেই, ফলে মেদচর্বিহীন বইটা একদম সবে বই পড়া শুরু করেছে তাদেরও আগ্রহ জাগাবে।
_____________________________

ছবি কৃতজ্ঞতা: সুমাইয়া আক্তার মনি। অনেক ভালো আঁকতে পারে মেয়েটা, সেই সাথে ছবিটাও সুন্দর করে তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *