March 2, 2024

এক মা আমাকে ই-মেইল করেছে। তিনি তার মেইলে লিখেছেন

এক মা আমাকে ই-মেইল করেছে। তিনি তার মেইলে লিখেছেন
প্রিয় লেখক,
শ্রদ্ধা জানবেন। আপনাকে এই পত্র লেখার কারন হচ্ছে আমার কন্যা। সে এবার ক্লাস ফাইভে উঠেছে। আমার স্বামীর উচ্চ শিক্ষার জন্য আমরা তিন বছর ইউরোপে ছিলাম। আমার মেয়ে ওখানে খুব আনন্দের সাথে স্কুলে যেত। এক দিন কোন কারনে স্কুলে যেতে না পারলে ওর মন খারাপ থাকতো। কিন্তু দেশে আসার পর দেখছি ও আর স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলের কথা শুনলে’ই ভয় পায়। প্রতিদিন বলে- মা আজ স্কুলে না গেলে হয় না? আমি জানি না আমাদের দেশের স্কুল গুলোতে লেখাপড়া কিভাবে শেখানো হয়। আপনি লেখক মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। আপনি যদি এই নিয়ে কিছু লিখতেন।
ভদ্রমহিলার মেইল পড়ে আমি এই লেখা লিখতে বসেছি। আমার মনে আছে প্রথম যেবার সুইডেনে এসছিলাম; আমার এক সুইডিশ বন্ধু এক উইকএন্ডে আমাকে বলেছিল
– চলো এই শনিবার আমরা সুইমিংপুলে গিয়ে সাঁতার কাটি।,
আমি ওর দিকে বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে বলেছি
-কিন্তু আমি তো সাঁতার জানি না।
– বলো কি! এটা কি করে সম্ভব?
– আসলে আমি তো শহরে জন্মেছি। তাই সেভাবে সাঁতার শেখা হয়নি।
আমার কথা শুনে মনে হলো ওর চোখ কপালে উঠার জোগাড়! আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না- এতে এত অবাক হবার কি আছে! এরপর ও আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে
– কিন্তু স্কুল থেকে সাঁতার শেখায়নি তোমাকে?
– কেন, তোমাদের কি স্কুল থেকে সাঁতার শেখানো হয় নাকি?
– হ্যাঁ; বেঁচে থাকার জন্য সে বিষয় গুলো বিপদে-আপদে দরকার হয়, সে গুলো তো স্কুল থেকেই শেখানো হয়।
সেবার আমি বুঝেছিলাম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আর ওদের শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে কতো পার্থক্য। আমি নিজেই এখন পড়াই এখানে। একটা খুব ছোট এবং সাধারণ ইউনিভার্সিটিতে আমি পড়াই। এখানে কোন ছাত্র যদি একটা প্রশ্ন করে; আমাদের কাজ হচ্ছে সে না বুঝার আগ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করেই যাওয়া। এরপরও যদি না বুঝে, দরকার হয় ক্লাস শেষে কোন রেস্তরাঁ কিংবা বারে বসে ওই ছাত্রের সাথে আলাপ করবো বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে। যাতে করে সে বিষয়টা সহজে বুঝতে পারে।
এই তো গত পরশু’ই একটা ভিডিও দেখছিলাম। স্পেস ষ্টেশনের নভোচারী’রা স্পেস থেকে সরাসরি সিক্স গ্রেডের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলছে। একবার চিন্তা করে দেখুন; ক্লাস সিক্সে পড়া বাচ্চা গুলো স্পেসে থাকা বিজ্ঞানীদের সাথে সরাসরি কথা বলছে। তাদের ইচ্ছা মত প্রশ্ন করছে। আমি তাদের প্রশ্ন-উত্তর গুলোর কয়েকটা শুধু তুলে দিচ্ছি
ছাত্রঃ আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তুমি এভাবে ভাসছো কেন?
নভোচারীঃ কারন এখানে কোন বাতাস নেই। আমরা থাকি জিরো গ্রাভিটিতে। তাই আমরা চাইলেই ভেসে বেড়াতে পারি।
ছাত্রঃ তাহলে তোমাদের ওখানে কি পানিও ভেসে বেড়ায়?
নভোচারীঃ এই জন্য আমরা রানিং কোন ওয়াটার ব্যাবহার করি না।
ছাত্রঃ তাহলে তোমরা কি ওখানে হাঁচি দেও না? হাঁচি দিলে কি হয় সেখানে?
এবার ওই নভোচারী নিজেই দুইবার হাঁচি দিয়ে দেখিয়েছে। এরপর বলেছে
নভোচারীঃ আমরা এখানে হাঁচি দেই। কিন্তু নাক থেকে খুব একটা কিছু বের হয় না। খুব হালকা কিছু হয়ত বের হয়। কিন্তু টেরও পাওয়া যায় না। এরপরও কিন্তু আমরা এখানে হাঁচি দিলে নাকে হাত দিয়ে ঢেকেই হাঁচি দেয়ার চেষ্টা করি।
ছাত্রঃ আমি শুনেছি স্পেস ষ্টেশন অনেক দ্রুত গতিতে চলে। কেন এত দ্রুত গতিতে চলে?
নভোচারীঃ ধরো তুমি একটা ছাদে উঠলে। সেখানে থেকে যদি সরাসরি লাফ দেও; তাহলে কি হবে? তুমি একদম সরাসরি নিচে পড়ে যাবে। কিন্তু তুমি যদি একটু দূর থেকে অনেক দৌড়ে এসে ঝাপ দাও; তখন কি হবে? তখন তুমি একটু দূরে চলে যাবে। কিন্তু এরপরও পড়ে যাবে নিচে। স্পেস ষ্টেশন এই জন্যই অনেক দ্রুত বেগে চলে। এতে করে সে যখন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে; সে পড়ে যায় না। দেখা যায় সে নিচে নামতে নামতে পৃথিবী কার্ভে (বেঁকে) যাবার কারনে পৃথিবীকে সে প্রদক্ষিণ করতে পারে।
ছাত্রঃ এর মানে তুমি কি সেখান থেকে পৃথিবীকে দেখতে পাচ্ছ?
নভোচারীঃ হ্যাঁ, আমি পৃথিবী দেখতে পাই। তুমি যেমন দেখো পৃথিবী থেকে চাঁদ- সূর্য।
ছাত্রঃ তাহলে তুমি এখন পৃথিবীর হিসেবে কোথায় আছো? তুমি তো বলেছ তোমরা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছ।
নভোচারীঃ আমরা প্রতি ৯০ মিনিটে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছি। হ্যাঁ, এটা এতই দ্রুত চলে! আমারা এই মুহূর্তে বোধকরি আছি পৃথিবীর হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি।
ছাত্রঃ তোমাদের ষ্টেশনের বাইরে তাপমাত্রা কেমন?
নভোচারীঃ সূর্যের দিকে প্লাস ১৫০ ডিগ্রী। কিছু দিলে সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাবে। আর সূর্যের অপরে পাশে; যে পাশে ছায়া; সেখানে মাইনাস ১৫০ ডিগ্রী। পানি রাখলে সঙ্গে সঙ্গে বরফ হয়ে যাবে!
ছাত্রঃ তোমরা যে ওখানে খাবার খাও। সে গুলোর স্বাদ কি তোমরা পাও?
নভোচারীঃ প্রথম কয়দিন কোন কিছুর গন্ধ পাই না। তাই স্বাদও অত পাওয়া যায় না। এরপর অবশ্য শরীর মানিয়ে নেয়। স্বাদও পাই।
ছাত্রঃ তোমার মাইকটা এভাবে উড়ছে কেন?
নভোচারীঃ ঠিক যে কারনে আমিও একটু ভেসে আছি। এখানে কোন বাতাস নেই। জিরো গ্রাভিটি।
ছাত্রঃ আমি তোমার মত নভোচারী হতে চাই। আমি তোমার মত ভেসে বেড়াতে চাই। আমার খুব ভাসতে ইচ্ছা করছে।
নভোচারীঃ গুড লাক। বড় হলে নিশ্চয় আমার মত ভেসে বেড়াবে।
তো এরা হচ্ছে সিক্স গ্রেডে পড়া ছাত্র-ছাত্রী। কোন রকম ভয়-সঙ্কোচ ছাড়া সরাসরি নভোচারীদের সাথে কথা বলছে। আর আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা এই বয়েসে কি শিখছে? আমার ঠিক জানা নেই এই যুগে কি শিখে। তবে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নানা’ন গ্রুপের আলোচনা গুলো দেখলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়- এই বয়েসে এরা এইসব কি আলোচনা করছে! আমি বিদেশে থাকছি ১৮ বছর হয়ে গিয়েছে। দেশের স্কুল-কলেজ গুলোর অবস্থা কেমন আমার ঠিক জানা নেই। তবে এই মায়ের ই-মেইল পড়ে মনে হচ্ছে তেমন একটা বদলায়নি। আমার সময় আমি যখন সিক্স স্ট্যান্ডার্ডে পড়াশুনা করেছি। কিসের পড়াশুনা শিখবো! আমি তো টিচার আর ক্লাস ক্যাপ্টেনের ভয়ে’ই অস্থির থাকতাম! সব সময় মনে হতো ক্যাপ্টেন আমার রোল-নাম্বার বোর্ডে লিখে রাখবে আর স্যার এসে আমাকে মারবে!
দেশে থাকতে আমি আমার প্রায় পুরো শিক্ষা জীবন পার করেছি ভয় আর সংশয় নিয়ে! অথচ পশ্চিমা বিশ্বে প্রথমেই শেখানো হয়- ভয় এবং সংশয় থাকলে তুমি কোন কিছু ভালো ভাবে শিখতে পারবে না। তাই ইচ্ছা মত প্রশ্ন করতে হবে। আর দেশে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তার কোর্সের প্রথম ক্লাসে এসে আমাদের বলেছিল- “এটা অত্যন্ত কঠিন কোর্স। কিছুই বুঝবে না। পাশ করতে পারলে মনে করবে বিশাল কিছু।” এবং উনারা এমন ভাবে পড়াতেন; একটা সহজ বিষয়কেও জটিল মনে হতো। শুনেছি যার কোর্স যত জটিল; সেই শিক্ষকের নাকি তত বেশি দাম আমাদের দেশে! আর ইউরোপ-আমেরিকায় স্পেস টেকনোলোজির মত জটিল বিষয় কিনা কতো সহজ ভাবে স্বয়ং নভোচারী একটা ক্লাস সিক্সের বাচ্চাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এবার বুঝে নিন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোথায় আছে।
©আমিনুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *