March 1, 2024

একটি ডিভোর্স লেটার ২য় পর্ব

ধারাবাহিক গল্প
একটি ডিভোর্স লেটার
২য় পর্ব
“সেদিন রাতে ফিরে এসে তুমি একটা কথাও বললে না। কেঁদে আমার চোখমুখ ফুলে লাল হয়েছিল।ভেবেছিলাম হয়ত রাগের মাথায় কাজটি করেছ।এবার হয়ত সরি বলবে।আমাকে অবাক করে দিয়ে তুমি শুয়ে ঘুমিয়ে গেলে।ফিরেও তাকালে না।আমার শ্বাশুড়ি রাতে খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেছেন।আমি খেতে যাইনি।সকাল বেলা নয়টায় ক্লাস আমার।সারারাত ঘুমাতে পারিনি বলে উঠতে দেরি হয়ে গেছে।ক্যামব্রিয়ান কলেজ শৃঙ্খলার ব্যাপারে খুব কড়া।তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছি।মাথা ঘুরছে।আজ ক্লাসে লেকচার দিতে পারব কি না জানি না।তুমি অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নাশতা করতে বসেছ।আমি না খেয়ে বের হয়ে যাচ্ছি দেখে শ্বাশুড়ি আমাকে বললেন, না খেয়ে যাচ্ছ যে? রাতেও খাওনি।কি ব্যাপার? কি হয়েছে তোমাদের?
যেন তিনি কিছুই জানেন না। তুমি ঝটপট উত্তর দিল, খেলে খাবে না খেলে না খাবে।অত সাধাসাধি করবে না।দেখি কতক্ষণ না খেয়ে থাকে।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছি।আমার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে পানিতে।আমি সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে পারছি না।চোখে দেখতে পাচ্ছি না।তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখ মুছে গিয়ে রিকশায় উঠতে যাব।হঠাত খেয়াল করলাম ব্যাগ আনিনি।আবার উপরে উঠলাম।বাসার দরজা ভেজানো ছিল।আমি ঢুকতে যাব ঠিক তখনি শুনতে পেলাম আমার শ্বাশুড়ি বলছেন, বৌকে একদম লাই দিয়ে মাথায় তুলবি না।সবসময় টাইট দিয়ে রাখবি।একবার মাথায় উঠলে আর নামাতে পারবি না বলে রাখলাম।
আমি শুনতে চাচ্ছি তুমি কী বলো।শ্বাশুড়ি আবার বলতে থাকলেন, কত মেয়ে দেখালাম তোর পছন্দ হলো না।তোর পছন্দ হলো তাকে।নারায়নগন্জ শহরে বাড়ি।বাবা অধ্যাপক। কেন বাপু ঢাকা শহরে এত বাড়ি গাড়িওয়ালা পাত্রী তুমি চোখে দেখলে না।কত বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী পরিবার ছিল।
কি লাভ হল? মুখে মুখে কথা বলে?
আমি অবাক হলাম তুমি একটা কথাও বললেনা।চুপ করে থাকলে।
আমার মাথা ঘুরছিল।ঘরে না ঢুকে আবার নীচে নেমে গেলাম।
সেদিন সিএনজি নিয়ে গিয়ে এক সহকর্মীর কাছ থেকে আসা যাওয়ার ভাড়া আর খাওয়ার টাকা ধার নিয়েছি।আজ এত বছর পর এসে আমি ভাবি সেদিন আমি কেন তোমার বাড়িতে ফিরে গেলাম। একটা সামান্য ব্যাপারে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে যে এভাবে অপমান করতে পারে তার কাছে আমি কীভাবে ফিরে গিয়েছি আজ ভাবলে আমার নিজের উপর ঘৃনা হয়। কেন যে কাপুরুষের স্ত্রীবাচক শব্দটি প্রচলিত হয়নি তাই ভাবি।
ঠিক দুইমাস ছাব্বিশ দিন আগে এ বাড়িতে বৌ হয়ে এসে প্রথম দিন মনে হয়েছিল আমি বোধ হয় ঠিক জায়গাতেই এসেছি। সবার সামনে শ্বাশুড়ি মায়ের আন্তরিক অভ্যর্থনা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
দুদিন পর তিনি কথায় কথায় বললেন,বিয়েতে আমার বাবা কোনো আসবাবপত্র দেননি বলে উনি সবার কাছে ছোটো হয়েছেন।
আমি বলেছিলাম, আমার বাবা একটা নীতি মেনে চলেন। তিনি যৌতুক দেয়া এবং নেয়ার ঘোর বিরোধী। চাইলে তিনি সবই দিতে পারতেন।
তিনি বললেন, নীতি তো আর সমাজ বুঝবে না।সমাজ বলে তো একটা কথা আছে।
আমি বিনয়ের সাথে বলেছিলাম, সমাজটাকে তো আমি আপনিই চেন্জ করব মা।
তিনি কিছু বললেন না।
আমি রাতে তোমাকে কথাটি বললাম।তুমি বললে, হ্যা শুনলাম তুমি মায়ের সাথে তর্ক করেছ। চুপ থাকলেই তো পারতে।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।এরই মধ্যে উনি অফিসে ফোন করে বলে দিয়েছেন আমি তার সাথে তর্ক করেছি।
আমি বলেছিলাম, কই আমি তো তর্ক করিনি।৷ বুঝিয়ে বলতে চেয়েছি।
তুমি বলেছিলে, ওই হলো।একই কথা।
বলে তুমি এমন ভাবে চুপ করে থাকলে যেন তোমার মায়ের কথাটিই সত্যি।
সেদিনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার জীবনে একটা অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে।যে ভুল সংশোধনের রাস্তা থাকলেও তার মূল্য অনেক বেশি।
সেদিন আমি খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম এ বাড়িতে থাকতে হলে আমাকে এই অসম্মান নিয়েই থাকতে হবে।বাবা মায়ের ভালেবাসায় পরিপূর্ণ এই আমি এত ভালোবাসাহীন, সম্মানহীন আচরন কখনো ভাবতেও পারিনি।দরজা বন্ধ করে হাউমাউ করে কাঁদলাম আর ভাবলাম এখানে আমি সারাজীবন কী করে কাটাব”?
হয়ত নিরুপায় হয়েই এত অপমানের কথা না মাকে বলতে পারছিলাম।না-কোনো সহকর্মীকে।না কোনো বন্ধু কে।কী করে বলি।নতুন স্বামী স্ত্রীর ভালোলাগার ঘোর কাটতেই তো বছর কেটে যায়।সেখানে তিন মাস না হতেই আমি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি তা কীভাবে সামাল দেব আমি বুঝতে পারছিলাম না।
প্রথম থেকেই খেয়াল করেছি তুমি শারীর সর্বস্ব মানুষ।কথা বার্তা ভাব ভালোবাসা আর আবেগের চেয়ে শরীরের প্রতিই তোমার মনোযোগ বেশি।তোমার ধারনা এটাই নাকি ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। আমি অবাক হয়েছিলাম। আসলেই কি ভালোবাসা মানেই শরীর? ভালোবাসা ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক কি সম্ভব? যেখানে ভালোবাসা নেই, সম্মান নেই সেখানে কী করে শারীরিক সম্পর্ক হয়? কোনটা আসলে ঠিক? আজ তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই এই এতটা বছর আমি শুধু তোমার কার্যকলাপ দাঁতে দাঁত চেপে হজম করেছি।এ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।
সেদিন তোমার মায়ের মুখে এসব কথা শোনার পর আমি তার সাথে ফ্রি হতে পারছিলাম না।স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারছিলাম না।তিনি তোমার কানে কি লাগিয়েছেন জানি না।তুমি অফিসে যাওয়ার আগে রুদ্রমূর্তি হয়ে ঘরে ঢুকলে। আমি রেডি হচ্ছিলাম।তুমি উত্তেজিত হয়ে বললে, তুমি কি এমন বিশিষ্ট শিল্পপতির মেয়ে যে তোমার এত অহংকার?
আমি হতভম্ব হয়ে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।তুমি গড়গড় করে বলেই যাচ্ছিলে,আমার মায়ের সাথে তুমি মুড দেখাও। এসব এখানে চলবে না।ঠিকমত থাকতে পারলে থাকবে নাহয় এখানে তোমার থাকার দরকার নেই। তোমার যেখানে খুশি চলে যেতে পার।
আমার মস্তিষ্কের সিগন্যাল সিস্টেম বোধ হয় অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। আমার দুঃখবোধ,রাগ বা বিস্ময়বোধ কোনোকিছুই কাজ করছিল না। আমি শুধু বাকশক্তিহীন হয়ে তাকিয়ে ভাবছি, একে আমি ভালোবাসি!যার মধ্যে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা থাকে সে কি এভাবে বলতে পারে?যার মধ্যে এতটুকু সম্মানবোধ থাকে সে কি এভাবে বলতে পারে?
হ্যা, কেঁদেছি আমি।অনেক কেঁদেছি। মস্তিষ্কের সিগন্যাল সিস্টেম হঠাৎ করে জেগে উঠে আমাকে অসাড় অবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনেছিল অনেক পরে।আমি কেঁদেছি মন ভরে।
এই তুমি কি সেই তুমি! যে আমার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে? আমার প্রতিটি কাজে ছিল তোমার মুগ্ধতা? একটা মানুষ কীভাবে এরকম বদলে যেতে পারে?
আমি পরে বুঝেছিলাম তোমার বদমেজাজী মায়ের সাথে এডজাস্ট করে নেয়ার মতো শান্ত মেয়ে খুঁজছিলে তুমি।আমাকে তোমার সেরকমই মনে হয়েছিল।তাই আমার ভালো লাগা না লাগা গুলো এমনভাবে উপেক্ষা করতে থাকলে যাতে আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারি।
আমি সেদিন আমার চাচার বাসা নিকুঞ্জে চলে গেলাম।
সাতদিন তুমি আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করোনি। তারপর তুমি হুট করে একদিন এসে আমাকে বললে, বাসায় চলো।
কোনোরকম অপরাধবোধ বা দুঃখবোধ তোমার মধ্যে ছিলো না।তারপরও আমি মনে মনে ভাবলাম হয়তো অনুশোচনা হয়েছে তোমার। কিন্তু এই ভাবনা আমার ভুল ছিলো।
বারবার এরকম ভুল ভেবে ভেবে আর কী করব কী করব ভাবতে ভাবতেই বছর পার হয়ে গেল।
আমার বিয়ের এক বছর পর বাবা মারা গেছেন।তুমি গিয়ে জানাজা পড়িয়ে চলে এলে। আমি আরো সাতদিন পর এলাম।রাত আটটার সময় এসে দেখলাম মা ছেলে টেলিভিশনে নাটক দেখছ। আমি বাবাকে হারিয়ে এতদিন পর এলাম তোমার
মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
তোমার মা কী করলেন না করলেন তা আমার ধর্তব্যের বাইরে। শুধুমাত্র স্বামীর ভালোবাসা মেয়েদেরকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দেবার সাহস যোগায়।
আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি আমার জীবন পাড়ি দেয়ার যে কাঙ্খিত অবলম্বন তোমার ভালেবাসার হাতটি তা আমার জন্য বাড়ানো নেই।আছে শুধু তোমার ইচ্ছেমত বেঁধে দেওয়া কতগুলো নিয়ম কানুন আর তোমার মায়ের দিকনির্দেশনা। তুমি যা চেয়েছিলে শুধু ভালোবাসার বিনিময়ে হয়ত তার চেয়েও বেশি পেতে পারতে। একটু ভালোবাসা দিলে একটা মেয়ে অনেক বড় ত্যাগ করতে পারে।
কিন্তু তুমি তা না করে উল্টো পথে হাঁটলে।
বাবার মৃত্যুর সাতদিন পর আমি এলাম। তোমরা কেউ এলেনা আমার মনের অবস্থা জানতে।ঘন্টা খানেক পর নাটক দেখা শেষ হলে তুমি এসে ঘরে ঢুকলে।আমার চোখে পানি। আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিলে না।আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলে না।আমার শরীর কেমন আছে জানতে চাইলে না। বাবাকে হারিয়ে আমার মা কেমন আছে জানতে চাইলে না একবারও।সরাসরি আমাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় নিয়ে গেলে।
আমি একদমই এখন এসব করার মুডে নেই।আমি নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,এসব কি?
তুমি বললে, না ভাবলাম তোমার মন খারাপ।মনটা একটু ভালো করে দেই।
আমি অবাক হয়ে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।এটাকে মন ভালো করা বলে? সেদিন আমার মনে হয়েছিল তুমি একটা জানোয়ার।আর একটা সভ্যতা ভব্যতাহীন একটা প্রানীর সঙ্গে আমি রয়ে গেলাম শুধুমাত্রই সমাজ, সংস্কার আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে। আমার নিরীহ বাবা, যার অনেক সুনাম এবং সম্মান ছিল তাকে সমাজের কাছে ছোটো করতে চাইনি, তাই তোমার সাথে রয়ে গেলাম আমি”।
………………………………
এই লাইনটি পড়ে আজাদ চমকে উঠল।ডায়েরি বন্ধ করে সে পাশে রেখে শুয়ে পড়ল।অনেক অনেক লিখা আছে আরো।একসাথে এতসব পড়ার মানসিকতা নাই তার এখন।রান্নার খালা হাসুর মা এসে ডেকে গেল খাওয়ার জন্য। আজাদের এখন খাওয়ারও ইচ্ছে নেই।অপমান আর একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশংকায় সে অস্হির।
চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *