February 26, 2024

আহাম্মকের খুদকুড়ো – দুর্লভ সূত্রধর

গালিভার, লিলিপুট আর পিগমি
……………………………………..
রঙদোলের মতোই আর-এক উৎসব ছিল ঝুলন যাত্রা।

ঝুলনের প্রস্তুতি ছিল রঙদোলের থেকেও বেশিদিনের এবং মেধাসাপেক্ষ। রথের মেলা থেকে মাটির পুতুল আর প্লাস্টিকের যানবাহন কেনা হতো। ঝুলনের কাঁচা মাটির ছাঁচের পুতুলের দাম ছিল খুব কম। লাঙল-কাঁধে চাষি, মজুর, গোরু, বাঘ, সিংহ, উট, কলসি কাঁখে গ্রাম্য বধু, সন্তরণরত হাঁস, ট্রাফিক পুলিশ, বাঙ্গারু, হাটুরে, মৎস্য ও তরকারি বিক্রেতা, এস্কিমো, জেলে, কামার, কুঁড়েঘর, ফুটবল খেলোয়াড়, পুরোহিত, নৌকা, গোপাল ঠাকুর ইত্যাদি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী পিচবোর্ড দিয়ে তৈরি করা হতো শহরের বাড়ি, হাসপাতাল ইত্যাদি। বড়োরা ঝুলনকে পুতুলখেলার থেকে বেশি কিছু বলে মনে করতেন না, তার ওপর এক লপ্তে সাত-আট দিন পড়াশোনায় ফাঁকি ! বড়োরা ঠাট্টা করে বলতেন—’তোরা যেমন লিলিপুট বা পিগমি, তেমনি ছোটো ছোটো পুতুল নিয়ে তোদের কারবার !’

তখন সদ্য সদ্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাপ্পাদিত্য’ পড়েছি। কুলন পূর্ণিমার দিনে বনের মধ্যে রাখাল রাজা বাপ্পার সঙ্গে শোলাঙ্কি রাজকুমারীর বিয়ে। প্রাক্ জ্যোৎস্নায় চাঁপাগাছে ঝুলনা বেঁধে দুজনে দোলায় বসলেন, আর রাজকুমারীর সখীরা তাদের ঘিরে গান গাইতে লাগল— ‘আজ কী আনন্দ, ঝুলত ঝুলনে শ্যামর চন্দ!’ শোলাঙ্কি রাজকুমারীর সৌরভ তখন আমাদের মধ্যে টাটকা ছিল। এছাড়াও আমাদের পাঠসীমার মধ্যে লিলিপুটের দেশে গালিভার যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন পিগমিদের নিয়ে কারবার করা অরণ্যদেব, কমিকসের বইতে যিনি ছিলেন বেতাল, অশরীরী। দেদার কমিকস পড়ে আমরা সেসব বৃত্তান্ত মোটামুটি জানতাম। দেখতে গেলে লিলিপুট বা পিগমিদের শরীর ছোটো হলেও তাদের মেধা কম ছিল না। গালিভার তো লিলিপুটদের রীতিমতো মেধাবী ও সহৃদয় করে এঁকেছেন। সে-দেশে গালিভারের জন্য লিলিপুটদের সম্রাট যে দৈনিক খাবার ও পানীয় বরাদ্দ করেছিলেন তার পরিমাণ ছিল ১৭২৮ জন লিলিপুটবাসীর খাবারের সমান। এই মাপটি হিসেব করা হয়েছিল রীতিমতো গাণিতিক উপায়ে। একজন লিলিপুটের দেহের অনুপাতে গালিভারের শরীর মেপে একজন লিলিপুটের খাবার ও পানীয়ের পরিমাণের গুণিতকে যে সংখ্যা পাওয়া যায় তাই। লিলিপুটদের প্রধান নগর মিলডেনডোকে জোনাথন সুইফট্ বেশ আধুনিক নগর বলেই বর্ণনা করেছেন। লিলিপুটদের তিরে গালিভারের শরীরে যে ক্ষত বা জ্বালা দেখা দিয়েছিল, যত্ন করে সুগন্ধী মলম লাগিয়ে তার নিরাময় করেছিল লিলিপুটেরাই। গালিভারকে বয়ে নিয়ে যাবার জন্য যে যানটি বানানো হয়েছিল তাতেও অসামান্য প্রযুক্তি-বুদ্ধির পরিচয় ছিল।

অন্যদিকে কাল্পনিক দেশ বেঙ্গালার সমুদ্র তীরে অচেতন প্রথম বেতাল বা অরণ্যদেবকে শুশ্রূষা করে বাঁচিয়েছিল ব্যাণ্ডার উপজাতির পিগমিরা। পিগমিরা অরণ্যদেবের অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের সর্দার চিকিৎসক গুরান বা শ্রেষ্ঠ ব্যাণ্ডার যোদ্ধারা অরণ্যদেবের বন্ধু। তার মানে পিগমিরা আমাদের মতো বালক কিশোরদেরও বন্ধু ! গুরান অত্যন্ত জ্ঞানী ও বেঙ্গালার জঙ্গলের সব রহস্য গুরান জানে। জংলি হলেও বুড়ো মজ ছিল জ্ঞানী লোকস্মৃতির ভাণ্ডারি। সুতরাং লিলিপুট বা পিগমিদের হতচ্ছেদ্দা করবার কিছু নেই। ছোটোরা ছোটো নয়—এটা বড়োরা কোনোদিনই বোঝেননি।

ঝুলনের ছোটোমাপের পুতুলগুলো আমাদের কাছে প্রায় জীবন্ত ছিল, অন্তত ঝুলন সাজাবার সময় আমরা অতি যত্নে আমাদের পঠিত জগৎসহ চারপাশটাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করতাম।

বইয়ে দেখা ছবি অনুযায়ী কাল্পনিক পাহাড়, পাহাড়ে গুহা, গুহামুখে বাঘ-সিংহ, পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ী গ্রাম। কাঁচ দিয়ে জলাশয়। বাঘের অত কাছে দু চারটি গরু দিব্যি ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের কাছেই এস্কিমোদের ঘর। যারা রথের মেলা থেকে পুতুল কিনতে গিয়ে উট কিনে বসতো, তাদের ঝুলনে পাহাড়ের কাছাকাছিই বালি বিছিয়ে মরুভূমি। যারা করত আর যাঁরা দেখতেন তাঁদের কারও বিশ্বাসবোধ এতটুকু আহত হতো বলে মনে হয় না। গ্রাম, গ্রামের বাড়ি, ধান কাটা কৃষক, গ্রামের পথে গরুর গাড়ি। তারপরই শহরের শুরু।

পিচের রাস্তার জন্য কয়লার গুঁড়ো, কাঁচা রাস্তার জন্য সুরকি, গ্রামের রাস্তার জন্য মাটি। পরে করাত কল বা কাঠগোলা থেকে কাঠের গুঁড়ো এনে তা কালো রঙ করে পিচ-রাস্তা এবং সবুজ রঙ করে মাঠ বানানো হতো। ফসলের ক্ষেতের জন্য ঘাসসুদ্ধু মাটির চাপড়া, তুলো দিয়ে বরফ আর এস্কিমোদের বরফের বাড়ি, নাম তার ইগলু।

পুকুর বা জলাশয়ের জন্য বড়ো ভাঙা কাঁচের টুকরো, কখনও কখনও রীতিমতো মাটি দিয়ে ঘিরে সত্যিকরের জল দিয়ে তার মধ্যে মেলা থেকে কেনা টিনের তৈরি কেরোসিন চালিত নৌকা। পিচবোর্ড দিয়ে তৈরি বাড়ি-ঘর, দোকানপাট ইত্যাদি। যাদের ঝুলনে আমাদের সর্বজনগ্রাহ্য আর্টিস্ট প্রণবদা হাত লাগাতো সেই ঝুলনের চেহারা যেত খুলে।

সদ্য-শেখা সাইফন-সিস্টেমে ঝর্ণা বানানো হতো, ঝর্ণার মাথায় আবার কেউ পিংপং বল ছেড়ে দিয়ে নাচাতো, কোনো ঝুলনে রাধাকৃষ্ণের দোলনা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দুগত, কোথাও সবাইকে চমকে দিয়ে ত্রুটি ল্যাম্পের মিনিয়েচার তৈরি করা হতো এবং তাতে ব্যাটারি দিয়ে টুনি বাল্ব জ্বলত, কোথাও সত্যিকারের জলাশয়ে চলন্ত মোটর বোট দেখা যেত, টিউবওয়েল দিয়ে জল পড়ত — পাহাড়ের গা বেয়ে নদী নেমে আসা, টানেলের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলা, দুটি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে গাড়ি—আরও কত কী। তবে জায়গা ও পয়সার অভাবে বেশিরভাগ ঝুলনেই ক্ষেতের তুলনায় বেঢপ চাষি কিংবা কয়েকজন খেলুড়ে দিয়েই গোটা একটা ফুটবল টিম বোঝাতে হতো, একটা মাত্র বলদ লাঙল টানছে—এমনটাও হামেশাই দেখা যেত। সেদিনের ঝুলন আজকের থিম প্যাণ্ডেলের আদি পিতা! সেদিনের ঝুলন-সজ্জায় উপকরণের টানাটানি সত্ত্বেও কঠোরভাবে বাস্তব ও প্রকল্পনার মেলবন্ধন ঘটাতে হতো। আমাদের সেই উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল-ঘেঁষা শহরে বেশ কয়েকটি উত্তরপ্রদেশীয় পরিবার ছিলেন। শোনা যেত নাকি এঁরা এসেছিলেন বৃন্দাবন ও মথুরা অঞ্চল থেকে। নানা ধরনের ব্যবসা, এজেন্সি ও তেজারতি কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এঁরা। না বলে দিলে কারও বোঝার উপায় ছিল না তাঁদের প্রাদেশিক পরিচয়। এঁরা দীর্ঘকাল আগে এই অঞ্চলে ব্যাবসাসূত্রে এসেছিলেন। তারপর থেকে গেছেন এই দেশে। বাড়ির ভেতরে এঁরা কীভাবে নিজেদের পরম্পরা রক্ষা করতেন জানা নেই, কিন্তু বাইরে ছিলেন শহরেরই একজন। শহরের জীবনে এঁদের বিশেষ অবদানও ছিল, কেউ স্থাপন করেছিলেন স্কুল, কেউ-বা অতিথিশালা। কিন্তু পরিবারগুলির ভেতরে উঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ বাইরের লোকের ছিল না। পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্থানীয় বাংলা মাধ্যম স্কুলেই পড়াশোনা করত। মেয়েরা ছিল গৌরাঙ্গী ও রীতিমতো সুন্দরী। পরিবারগুলি বেশ ধনী ছিল। ঝুলনযাত্রা ছিল এঁদের কারও কারও পারিবারিক উৎসব। বাড়িতে স্বতন্ত্র মন্দির বা ঠাকুর দালানে কৃষ্ণ-রাধা নিত্য পূজিত হতেন। দোল আর ঝুলন বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হতো। এই ধরনের কয়েকটি পরিবারের ঝুলনযাত্রা ছিল দেখবার মতো। বিশাল ঠাকুর দালান জুড়ে রীতিমতো বায়না দিয়ে পরিকল্পনামাফিক পুতুল তৈরি করানো হতো, তদানীন্তন নামি-দামি কোম্পানিকে দিয়ে প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটানো হতো। ঝুলনের সাতদিন শহরের বাইরে থেকেও প্রচুর দর্শনার্থী আসতেন ঝুলন দেখতে। ঝুলন উপলক্ষে নাকি শুকনো খাবার ও বহিবঙ্গীয় খাওয়া-দাওয়ার যথেষ্ট প্রাচুর্য দেখা যেত। স্বাভাবিকভাবেই শহরের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অভিসম্পন্ন পরিবারগুলোর সঙ্গে ছিল এঁদের প্রধান লেনদেন। তাঁরাই পারিবারিকভাবে আমন্ত্রিত হতেন। সুতরাং দেবতার ভোগের আসরে আমাদের ডাক পড়ত না।

সাধারণ ঘরের ঝুলনের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ছিলেন গোপাল ঠাকুর। তিনি ঝুলন সজ্জার ঠিক সামনে থালা পেতে হাসি হাসি মুখে বসে বা হামা দিয়ে হাত বাড়িয়ে থাকতেন, তাঁর আবীর-কুঙ্কুম চর্চিত হাসিমুখ দেখে সামনের থালায় দর্শকদের খুচরো বর্ষণ হতো, আর শেষদিন সেই খুচরো গেঁথে লুচি, বেগুনভাজা, বোঁদে, পায়েস, আলুর দম বা ঘুগনির ভোজ! নিশ্চিতভাবে দর্শনির পয়সায় পঙ্গপালের মতো ছেলেমেয়েদের ঐ রাজকীয় ভোজের খরচ মিটত না—বাড়ির দিদি বা অভিভাবকদের ভর্তুকি দিতেই হতো! – আমাদের ঝুলনে আবার গোপাল ঠাকুর আর তাঁর সামনে থালা রেখে পরোক্ষে পয়সা চাওয়াটাকে সংস্কৃতি-বিরোধী বলে মনে করা হতো— সুতরাং আমাদের খাওয়া দাওয়ার সবটাই চলত মেজদিদের দেওয়া ভর্তুকির টাকায়!

আহাম্মকের খুদকুড়ো
দুর্লভ সূত্রধর

প্রচ্ছদঃ সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৮০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *