March 1, 2024

আঙ্কল টমস কেবিন PDF : হ্যারিয়েট বিচার স্টো

  • বইয়ের নামঃ আঙ্কল টমস কেবিন
  • লেখকঃ হ্যারিয়েট বিচার স্টো
  • অনুবাদকঃ জাকির শামীম
  • প্রকাশনীঃ নালন্দা
  • পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৬০
  • মুদ্রিত মূল্যঃ ২০০ টাকা

পৃথিবীর মানুষ মোটাদাগে দুই দলে বিভক্ত। সাদা চামড়া ও কালো চামড়া। সাদাকে বরাবরই সৌন্দর্য ও কালোকে কদর্যতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে সভ্য নামধারীরা। ফলস্বরূপ যাদের গায়ের রং কালো কিংবা শ্যামলা, তারা সবসময় সাদা চামড়ার মানুষের থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছে। গায়ের রং-এর বড়াই মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়ে পশুতে রূপান্তরিত করেছে। গায়ের রং এর প্রভাব কতটা নেতিবাচক তা বর্তমান সভ্য জগতের দিকে তাকালেও অনেকটা দেখা যায়। তবে অতীতে দাস প্রথা নামক বর্বরতার মাধ্যমে জঘন্য এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।


দাস প্রথার রূঢ় বাস্তবতাকে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপনের জন্য ১৮৫২ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। লেখকের নাম প্রথম দেখে আমি ভেবেছিলাম লেখক পুরুষ। পরে জানতে পারলাম তিনি মহিলা। যাই হোক লেখার মান বিচারে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সংযোজন বইটি। এমন এক সময়ে বইটি লেখা হয়েছে যখন আমেরিকায় আফ্রিকান দাস ব্যবসা রমরমা ছিল। শুধু গায়ের রং কালো হওয়াতে আফ্রিকার মানুষদের মানুষ বলে গণ্য করতোনা ইউরোপীয় ও আমেরিকান সাদা চামড়ার মানুষেরা। পুরুষদের ক্ষেত-খামার, কারখানার কাজ ও মেয়েদের বাড়ির চাকরানির কাজে এমনকি যৌনদাসী হিসেবেও নিয়োগ করা হতো। আর পান থেকে চুন খসলেই নির্যাতন সকল বর্বরতার উর্ধ্বে গিয়ে মৃত্যুও ডেকে আনতো। বইটি প্রকাশের পর ব্যপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। দাস প্রথার বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা দেয়। এমনকি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পেছনে বইটির ভূমিকা আছে বলে অনেক ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন।


তখনো আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়নি। আমেরিকার কেন্টাকি শহরের বাসিন্দা শেলবি দম্পতি আর্থার শেলবি ও এমিলি শেলবি এবং তাদের সন্তান জর্জ শেলবিকে নিয়ে গোছানো সংসার। আমেরিকায় তখন প্রায় সবার বাড়িতেই কাজের জন্য আফ্রিকান দাস ছিল। তেমনি তাদের বাড়িতেও ছিল কয়েকজন দাস। আঙ্কল টম যে কিনা মিস্টার শেলবির ছোট বেলা থেকেই এই বাড়িতে বসবাস করে; মিসেস শেলবির পরিচারিকা এলিজা ও তার সন্তান জিমও এই বাড়িতে দাস হিসেবে থাকে। আমেরিকার মধ্যে সম্ভবত কেন্টাকি রাজ্যতেই মনিবেরা দাসদের প্রতি নমনীয় ছিল। শেলবি দম্পতিও ব্যতিক্রম ছিল না। দেনার দায়ে মিস্টার শেলবি সিদ্ধান্ত নেয় টমকে বিক্রি করে দেওয়ার। যদিও তার ইচ্ছা ছিল না, এতদিন ধরে তাদের সাথে বসবাস করে পরিবারের একজন সদস্য বনে যাওয়া দাসকে বিক্রি করার। তবু ভাগ্যের লিখন বলে কথা! আঙ্কল টম ও জিমকে বিক্রি করার জন্য গোপন বৈঠকে বসেছিল মিস্টার শেলবি ও দাস ব্যবসায়ী হ্যালি। তাদের এই কথোপকথন শুনে ফেলে এলিজা। সন্তানকে হারাতে চায়না সে। তাই জিমকে সাথে নিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয় এলিজা। সাহায্য নেয় আঙ্কল টমের। তারা মা-পুত্র কি পারবে নিজেদের আলাদা হওয়া থেকে রক্ষা পেতে?


আঙ্কল টম একজন ধর্মভীরু খ্রিস্টান দাস। এমনকি মনিবের ব্যবসার কাজেও একজন বিশ্বাসী লোক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে টম। তবুও দেনার দায় মেটানোর জন্য একসময় টমকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় হ্যালির নিকট। মিসিসিপি নদীতে হ্যালির সাথে নৌকায় চড়ে যাওয়ার সময় টমের সাথে ইভানজেলিনের পরিচয় হয়। ইভানজেলিন নিউ অরলিয়েন্স শহরের অগাস্টিন সেন্ট ক্লেয়ারের কিশোরী কন্যা। মেয়েটিকে সবাই ইভা বলে ডাকে। নৌকা থেকে অসতর্কতাবশত ইভা পানিতে পড়ে যায় এবং টম তাকে বাঁচায়। খুশি হয়ে অগাস্টিন টমকে হ্যালির থেকে কিনে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। নতুন মনিবের বাড়িতে টমের জীবন ভালোই যাচ্ছিল। কিছুদিন পর ইভা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্বপ্নে দেখার পর বাবার নিকট আবদার করে সকল দাসকে মুক্ত করে দেওয়ার। মেয়ের কথা চিন্তা করে অগাস্টিন সাহেব সবাইকে মুক্ত করার ঘোষণা দেন। তবে ঘোষণা কার্যে পরিণত হওয়ার আগেই তিনি নিহত হন। অগাস্টিনের স্ত্রী মেরি দাসদের প্রতি নমনীয় ছিল না। অগাস্টিনের মৃত্যুর পর টমকে সাইমন লেগ্রি নামক এক বর্বর দাস ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রি করে দেয়। টমের জীবন যেন দূর্বিষহ হয়ে উঠে নতুন মনিবের কাছে আসার পর। কী হয় তার পরবর্তী জীবনে? যা পাঠককে তাড়িয়ে বেড়াবে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।


বইটা আমি প্রথম দেখেছিলাম মাধ্যমিকে সেকায়েপের বিদ্যালয়ভিত্তিক লাইব্রেরিতে। তবে তখন আমি বইটা পড়িনি। পরে বইটি কিনে পড়েছিলাম। পড়তে পড়তে কখন যে আপনার চোখে পানি চলে আসবে আপনি টেরও পাবেন না। যারা হলিউডের ’12 Years A Slave’ মুভিটা দেখেছেন তারা মুভির সলোমন নর্থপ চরিত্রের সাথে এই বইটির আঙ্কল টম চরিত্রকে মেলাতে পারবেন। দাস প্রথার মর্মান্তিক এক অধ্যায়ের চিত্রায়ন করেছেন সুলেখিকা হ্যারিয়েট বিচার স্টো।


ঔপনিবেশিক যুগে আফ্রিকা থেকে বহু মানুষ দাস হিসেবে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। যাত্রা পথেই মৃত্যু ঘটেছে অনেক মানুষের। আবার অক্লান্ত পরিশ্রম কিংবা অমানুষিক নির্যাতনের কারণেও অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের মানুষ বলে গণ্যই করা হতো না। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর ষোড়শ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা রহিত করে আইন প্রণয়ন করেন। তখন থেকে আস্তে আস্তে এই বর্বরতা কমে আসে। তবে সাদা-কালোর পার্থক্য মানুষের মগজে এখনো রয়েছে। যার ফলে আমরা প্রায়ই কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতন এবং তাদের রাজপথে নেমে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে দেখি।
বইটি আপনাকে দুই শতাব্দী পূর্বের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। অনুবাদ যথেষ্ট ভালো। তবে বইটিতে লেখক বা অনুবাদক পরিচিতি কিংবা ভূমিকা কোনোকিছুই নেই। সরাসরি গল্প শুরু হয়েছে। সকল বয়সী পাঠক বইটি পড়তে পড়তে এক মর্মান্তিক যাত্রার সাক্ষী হতে পারবেন। download link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *